Home » Bengali News » সফল হওয়া সত্ত্বেও ক্রিকেটের মেয়েরা উপেক্ষিত

সফল হওয়া সত্ত্বেও ক্রিকেটের মেয়েরা উপেক্ষিত

হাইলাইটস

  • কয়েক মাস আগেই ব্রিসবেন-এ ঐতিহাসিক টেস্ট জয়ের পর আহমেদাবাদে বাজি পুড়ল।
  • ঋষভ পন্থের উইনিং স্ট্রোক, পূজারার শরীরে কালসিটে, শুভমান গিলের লেট স্কোয়্যার কাট মুখে মুখে ফিরল পাড়ার আড্ডায়।
  • ক্রিকেট নিয়ে এই যে আবেগের স্বতঃস্ফূর্ত স্রোত বইল দেশে।

অর্পণ গুপ্ত

স্মৃতি মন্ধানা সেঞ্চুরি হাঁকালেন। হেলমেট খুলতে মুখের ওপর উড়ে এল অবিন্যস্ত চুল। হারলিন কওর মজা করে টুইট করলেন, ‘অ্যালেক্সা, প্লিজ প্লে ও হাসিনা জুলফোঁওয়ালি…’, মহম্মদ রফির হাসিনা জুলফোঁওয়ালির রোম্যান্টিসিজমে নিজেকে পেয়ে লজ্জা পেয়ে গেলেন স্মৃতি। ঝুলন গোস্বামীর আগুনে বোলিংয়ে একটু পরেই টলে যাবে অজি ব্যাটিং ভিত।

ভারতীয় মহিলা ক্রিকেটের ইতিহাসে ঝুলনের একের পর এক মাইলস্টোন খোদাই এখন স্বাভাবিক হয়ে গিয়েছে, অন্তত যাঁরা মহিলা ক্রিকেটের খোঁজ রাখেন তাঁদের কাছে এ জিনিস নতুন নয়। অথচ কিছু ব্যতিক্রমী টুইট, শুভেচ্ছাবার্তা বাদে সমস্ত চিত্রনাট্যটাই যেন আশ্চর্য নিরুত্তাপ। একটি জাতির শিরদাঁড়া বেয়ে নেমে যাওয়া উচ্ছ্বাসের স্রোত নেই।

কয়েক মাস আগেই ব্রিসবেন-এ ঐতিহাসিক টেস্ট জয়ের পর আহমেদাবাদে বাজি পুড়ল, দেশের আনাচে কানাচে ক্রিকেটমোদীদের ঢল নামল রাস্তায়, করোনা অতিমারিকে উপেক্ষা করে যেন উৎসবে মাতল দেশ। ঋষভ পন্থের উইনিং স্ট্রোক, পূজারার শরীরে কালসিটে, শুভমান গিলের লেট স্কোয়্যার কাট মুখে মুখে ফিরল পাড়ার আড্ডায়। ক্রিকেট নিয়ে এই যে আবেগের স্বতঃস্ফূর্ত স্রোত বইল দেশে, সম্ভবত ২০১১ সালে বিশ্বকাপ জয়ের পর এত বড় উদ্‌যাপন আর দেখিনি আমরা। অ্যাডিলেডে ওই ৩৬ অল আউট থেকে অজিদুর্গ গাবায় ভাঙাচোরা দল নিয়ে সিরিজ জয়ের মধ্যে একটা উত্থানের গল্প দেশবাসী খুঁজে পেয়েছিল।

ডিজিটাল ভারতে আজও চালু লক্ষাধিক ‘প্রসন্নর পাঠশালা’
দু’শো বছরের ঔপনিবেশিক শাসনে কুঁকড়ে থাকার যে অবদমিত অবস্থাকে আমরা মনে মনে জাপটে ধরে থাকি, তার পর কোনও এক মুহূর্তে এক আশ্চর্য সিঁড়ি বেয়ে উঠে ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ জানানোর যে চেনা গল্পকে আমরা মনে মনে কল্পনা করি, ব্র্যাডম্যানের দেশ যেন সেই মশলাই মজুত রেখেছিল চার ম্যাচের টেস্ট সিরিজের চিত্রনাট্যে। কিন্তু স্মৃতি মন্ধানা-ঝুলন-হরমনপ্রীতদের অস্ট্রেলিয়ার মাঠে টেস্টে অবিশ্বাস্য পারফরমেন্স কি এই গল্পের থেকে বহু দূরে? নাকি এই যে বিরাট উপাখ্যান তার কিছুটা নির্যাস দিয়ে অনায়াসেই সে হয়ে উঠতে পারত এক স্বতন্ত্র গল্প যার কাঠামোতে থাকত একই খড়ের বাঁধন? সেখানে একটি দেশের জনমানসের মনের একেবারে গভীরে থাকা কোনও বিন্দু একই ছন্দে আন্দোলিত হত? কিন্তু হয়নি। খুব তিক্ত সত্যিটা আমাদের হজম করে ফেলা প্রয়োজন। সমস্যা দর্শকের কাছে স্পষ্ট না হলে তার নিরাময় খোঁজা অলীক কল্পনা।

পুরুষ এবং মহিলা ক্রিকেটে মাঠের সাইজ প্রায় এক, খেলার নিয়ম এক, একই নীল জার্সি, একই ব্যাজ। এমনকী বর্তমানে মেয়েদের ক্রিকেটেও ১২০-র থেকে বেশি গতিতে বল ছুটছে যা কিছু বছর আগেও ছিল কল্পনাতীত। বিশ্বকাপ ক্রিকেটেও তো মহিলা ক্রিকেটারদের পারফরম্যান্স কোনও অংশে কম নয়। ২০০৫ এবং ২০১৭-র রানার্স আপ, ২০০৯-এ অর্জন করেছিল তৃতীয় স্থান। তার পরেও এই বৈষম্য থাকবে কেন?

এ প্রশ্নের মধ্যে থাকা অনেকগুলি স্তর আমাদের সামনে প্রকট হয়ে ওঠে। প্রথমত, ব্যক্তির আবেগ কোনও পণ্য নয় যা খুব সহজে কিনে ফেলা যাবে, তা ঘোরতর ভাবে স্বতঃস্ফূর্ত। হালফিলের ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেট বা ফুটবলের উদাহরণ যদি দেখি, সেখানেও কিন্তু সব ক্ষেত্রে দলগুলি আঞ্চলিক জনতার মনে স্থায়ী প্রভাব ফেলতে পারেনি। যা হয়েছে তা হল ব্যক্তিগত নৈপুণ্যে কোনও খেলোয়াড়ের প্রতি সঞ্চিত আবেগ জমা পড়েছে দলের ভাঁড়ারে কিংবা কোনও বিশেষ মুহূর্তে সেই দলের কোনও একটি জয়-পরাজয়কে জনতা মিলিয়ে ফেলতে পেরেছে ব্যক্তিগত চাওয়া-পাওয়ার চালচিত্রে।

বেপরোয়া রাষ্ট্রীয় হিংসাই নিয়ম হয়ে দাঁড়াল?
সে ক্ষেত্রে প্রশ্ন আসতে পারে যে জাতীয় মহিলা ক্রিকেট দলের জার্সিতে যে ব্যাজ, তা তো দেশের, পিঠের নাম আলাদা হলেও সচিন তেণ্ডুলকর কিংবা ঝুলন গোস্বামী একই জনতার ভার কাঁধে তুলেছেন। সেখানে তো আবেগের স্রোত উঠে আসা উচিত জাতীয়তাবাদের পুরনো দস্তাবেজ থেকেই, তার তীব্রতার তারতম্য হলেও অণুপরমাণুর বিভেদ থাকা কার্যত অসম্ভবই।

কিন্তু এই প্রসঙ্গে আলোচনায় খুলে যায় দ্বিতীয় একটি দরজা। যা আমাদের নিয়ে চলে যায় একটি সাক্ষাৎকারের কাছে। শ্রীরূপা বসু মুখোপাধ্যায়, ভারতীয় মহিলা ক্রিকেট দলের প্রাক্তন ক্যাপ্টেন ও কোচ তাঁর মৃত্যুর আগে একটি সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ভারতের হয়ে তাঁর খেলা টেস্ট ম্যাচটির কথা, যেটিকে প্রথমে অফিশিয়াল টেস্টের আখ্যা দেওয়া হলেও পরবর্তী সময়ে কোনো এক অজ্ঞাত কারণে আইসিসি এটির টেস্ট তকমা বাতিল করে।

একজন খেলোয়াড়ের কাছে এই নিমেষে তাঁর অর্জনের তকমা কেড়ে নেওয়ার অভিঘাত কী হতে পারে তা হয়তো বাইরে থেকে অনুমেয় নয়। কিন্তু এই যে বৈষম্য, যা ক্রমে ক্রমে স্বাভাবিক হয়ে উঠতে চেয়েছে, তার বিরুদ্ধে কি কোনও প্রতিবাদের ঋজু আঙুল উঠল আদৌ? কেউ কি এ প্রশ্ন করতে পেরেছিলেন যে সাতের দশকের পর পুরুষ ক্রিকেটে কোনও একটি অফিশয়াল টেস্টের আচমকা টেস্ট মর্যাদা কেড়ে নিলে তার কী প্রভাব পড়ত জনতার মনে?

২০১৭ সালের ১ অক্টোবর ক্রিকেটের সর্বোচ্চ নিয়ামক সংস্থা আইসিসি যে পরিবর্ধিত ও পরিমার্জিত ক্রিকেটের শ্রেণিবিন্যাস পদ্ধতি চালু করল তাও কি ঘোরতর বৈষম্যমূলক নয়? এখানে স্পষ্ট ভাবে বলা হল পুরুষদের ক্রিকেটে বয়সভিত্তিক অর্থাৎ আন্ডার নাইন্টিন, আন্ডার সেভেন্টিন ইত্যাদি ম্যাচগুলি বাদ দিয়ে অন্যান্য সব তিন-চার বা পাঁচ দিনের ম্যাচ গুলি ফার্স্টক্লাস এবং সকল প্রকার সীমিত ওভারের খেলাগুলি লিস্ট-এ খেলার স্বীকৃতি পাবে। কিন্তু এই ঘোষণাতে কোথাও মহিলা ক্রিকেটকে ফার্স্টক্লাস বা লিস্ট-এ-এর অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।

মেয়েদের ক্রিকেটকে শুধুমাত্র আন্তর্জাতিক টেস্ট, আন্তর্জাতিক এক দিনের ক্রিকেট ও আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে ভাগ করা হয়েছে এবং অন্যান্য সকল প্রকার ম্যাচ ‘কম্পিটিটিভ উইমেন’স ক্রিকেট প্লেড অ্যাট স্টেট প্রভিনশিয়াল লেভেল’ বলে উল্লেখ করা আছে। কিন্তু এ আমরা সকলেই জানি, আইসিসি-র রুল অনুযায়ী কোনও পাঁচ দিনের ম্যাচ যদি ফার্স্টক্লাস ক্রিকেটের তকমা না পায়, তাকে টেস্ট ম্যাচে উন্নীত করা যাবে না, একই ভাবে কোনও সীমিত ওভারের খেলা লিস্ট-এ অন্তর্ভুক্ত না হলে তাকে এক দিনের ক্রিকেটের মর্যাদা দেওয়া সম্ভব না।

তা হলে মহিলা ক্রিকেটের যে ঘরোয়া প্ল্যাটফর্ম, যেখান থেকে ক্রিকেটের প্রতি জনতার আত্মিক টানের প্রথম সুতোটা বাঁধা হয় সেই জায়গায় কি আদৌ কোনও শিকড়ের টান গড়ে উঠছে ক্রিকেটপ্রেমীদের সঙ্গে? কিছু দিন আগে মহিলা ঘরোয়া ক্রিকেটে ফার্স্ট ক্লাস আর লিস্ট-এ স্বীকৃতি চালু হলেও একটা দীর্ঘ সময় তাবড় মহিলা ক্রিকেটারদের কোনও ফার্স্টক্লাস বা লিস্ট-এ রেকর্ডই ছিল না।

ভারতীয় ক্রিকেটে বিরাট কোহলির আবির্ভাব লগ্নে আমরা উল্টেপাল্টে দেখে নিয়েছি তাঁর ফার্স্টক্লাসে করে আসা হাজার দশেক রান, চৌত্রিশটা সেঞ্চুরি, আমরা বারেবারে মিলিয়ে দেখেছি বাবার মৃত্যুর পরও তাঁর দিল্লির হয়ে ম্যাচ-বাঁচানো নব্বই রানের ইনিংস। বিরাট, সচিন, দ্রাবিড়, সৌরভ, কুম্বলেদের আন্তর্জাতিক মঞ্চে শামিয়ানা বিছানোর পিছনে যে স্বীকৃত ফার্স্টক্লাস কেরিয়ার, তা রাজ্যভিত্তিক জনতার মনে প্রভাবের পাশাপাশি তার ধারাবাহিক উত্থানের কাঠামো হিসেবেও থেকেছে। মহিলা ক্রিকেটে ঘরোয়া টুর্নামেন্টের সামান্য স্কোরকার্ড পাওয়াও দুষ্কর, ঝাঁসির রানি টুর্ণামেন্টটির স্কোর মিলিয়ে দেখতে গেলে কপালে ভাঁজ পড়ে ক্রিকেট গবেষকদেরও। ফার্স্ট ক্লাস বা লিস্ট-এ-তে অন্তর্ভুক্ত না হওয়ার পরেও ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশে মহিলা ঘরোয়া ক্রিকেটের যে সুস্পষ্ট বিন্যাস ও পরিকাঠামো তা ভারতে গড়েই ওঠেনি এত দিন।

মিতালি রাজ, স্মৃতি মন্ধানা বা শেফালি ভার্মারা হয়তো ব্যক্তিগত নৈপুণ্যে ম্যাচ জেতাচ্ছেন, আন্তর্জাতিক মানচিত্রে মহিলা ক্রিকেটকে আরও এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য জাতীয় দলকে দেওয়া হচ্ছে বিশেষ ট্রেনিং, কিন্তু সার্বিক ভাবে মহিলা ক্রিকেটের যে ভিত্তিগত ত্রুটি বছরের পর বছর থেকে গেছে, তা কোথাও গিয়ে ঐ বৈষম্যের সপক্ষেই দাঁড়াচ্ছে, দুশোর বেশি আন্তর্জাতিক উইকেটের পরেও তাই বৃহত্তর জনগণের মনে পাকাপাকি ভাবে জাহির খান ও ঝুলন গোস্বামী সমমাত্রার অভিঘাত আনতে পারছেন না।

এ বিষয়ে লক্ষণীয়, স্মৃতি মন্ধানার ক্যারারায় দুরন্ত সেঞ্চুরির পর যখন তাঁর অফসাইডে ধ্রুপদী ব্যাটিং-এর জন্য ওয়াসিম জাফর বলছেন ‘অফসাইডের ঈশ্বরী’, ঠিক তখন আমজনতার একটা বড় অংশের কাছে সেই অফস্টাম্পের বলে ড্রাইভ বা কাটের চেয়েও আকর্ষণীয় হচ্ছে তাঁর রূপ, হেলমেট খোলার পর এলোমেলো চুলে তাঁর মায়াবী মূর্তি। বিরাট কোহলির পেশিবহুল শরীর বা ট্যাটু হতেই পারে আকর্ষণীয় কিন্তু ক্রিকেটীয় ইতিবৃত্তকে তা ছাপিয়ে যেতে পারে না। স্মৃতির ক্ষেত্রে হল এর উলটো কারণ মহিলা ক্রিকেটকে হয়তো ক্রিকেটপ্রেমীর কাছে সেই তীক্ষ্ণ বিশ্লেষণের আওতায় আমরা এখনও নিয়েই আসতে পারিনি যা অনায়াসে ঢেকে দিতে পারে অ-ক্রিকেটীয় ফ্রেম।

সংক্রমণ কমেছে ঠিকই, বিপদ এখনও যায়নি
পুজো আসছে। দেবীপক্ষ শুরু হয়েছে। মিতালি-স্মৃতি-ঝুলন-শেফালিরা আচমকাই যেন খবরের শিরোনাম দখল করে ফেলতে চাইলেন সুদূর অস্ট্রেলিয়ার মাটি থেকে। আমরাও দু-এক কথা আলোচনায় তুলে আনছি। বিশ্বের দরবারে দেশের প্রতিনিধিত্বের পর এটুকুই কি প্রাপ্য ছিল তাঁদের? নাকি আরও বেশি কিছু দিতে পারতাম আমরা? কিছু দিন আগে পুরুষ ও মহিলা ক্রিকেটারদের সমান বেতনের দাবি উঠেছিল। বৈষম্যের বিরোধিতা হিসেবে এ দাবি অন্যায্য নয় কিন্তু কেন শ্রেষ্ঠ ভারতীয় ব্যাটসম্যানদের নাম উঠলে বিরাট-রোহিত আসেন, অথচ ওয়ান ডে তে প্রায় সাড়ে সাত হাজার রান করা মিতালি আসেন না, কেন তরুণ প্রতিভা হিসেবে যতটা লাইমলাইট ঋষভ পন্থ পান অথচ স্মৃতি মন্ধানা পান না- এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে সমস্যার আরও গভীরে পৌঁছনো আশু প্রয়োজন।

(এই প্রবন্ধে প্রকাশিত মতামত সম্পূর্ণ ভাবে লেখকের ব্যক্তিগত। এই সময় ডিজিটাল কোনও ভাবেই লেখার দায়ভার বহন করে না।)


Source link

x

Check Also

সঙ্গীতশিল্পী পিলু ভট্টাচার্যের জীবনাবসান, শোকের ছায়া বাংলার বিভিন্ন মহলে

প্রয়াত সঙ্গীতশিল্পী পিলু ভট্টাচার্য।  তাঁর প্রয়াণের খবর গতরাতেই সঙ্গীতমহলের অনেকের কাছেই পৌঁছে গিয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে ...